আজ রবিবার, ২০ মে ২০১৮ ইং

কাল বাজেট ঘোষণা : ২শ’র বেশি পণ্যে থাকছে না ভ্যাট

 প্রকাশিত : ২০১৭-০৫-৩১ ১৩:৩৯:১২

উত্তরপূর্ব ডেস্ক : বুধবার, ৩১ মে ২০১৭: আগামী অর্থবছর থেকে নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইন শেষ পর্যন্ত কার্যকর হবে। ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমানোর দাবি করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হার থাকছে বলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিচ্ছেন। রাজস্ব আদায় কমতে পারে এমন কোনো পদক্ষেপ থেকে দূরেই থাকলেন অর্থমন্ত্রী। এর ফলে কয়েক মাস ধরে ভ্যাট হার নিয়ে ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে টানাপোড়েন চলছিল।

তবে ভ্যাট হারে সন্তুষ্ট করতে না পারলেও বিপুলসংখ্যক পণ্য ও সেবায় ভ্যাট ছাড় দিয়ে ব্যবসায়ীদের খুশি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বাজেটে ঘোষণার ঠিক আগ মুহূর্তে ভ্যাট অব্যাহতির তালিকা বড় করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন করে দুই শর বেশি পণ্য ও সেবা ভ্যাটমুক্ত থাকছে। এর ফলে নতুন আইনে বিদ্যমান প্রায় ১৯ শ ভ্যাটমুক্ত পণ্য তালিকার সঙ্গে আরও দুই শ পণ্য ও সেবা যোগ হচ্ছে। ইতিমধ্যে এনবিআর সেই তালিকা চূড়ান্ত করেছে বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে নতুন ভ্যাট আইনই হচ্ছে অর্থমন্ত্রীর এবারের বিশাল রাজস্ব লক্ষ্য অর্জনের মূল অস্ত্র। সামগ্রিকভাবে আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এনবিআরকে ২ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে, যা চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্য থেকে প্রায় ৩৫ শতাংশ বেশি। আর নতুন ভ্যাট আইনের ওপরেই ভরসা করে আগামী অর্থবছরে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে চায় এনবিআর। ভ্যাট খাতে চলতি বছরের চেয়ে আগামী বছরে ৩৫ শতাংশ বেশি টাকা আদায় করাই লক্ষ্য। চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাতে সংশোধিত লক্ষ্য ঠিক করা আছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এরপর আয়কর খাতেই প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে। আর শুল্ক খাতে সবচেয়ে কম, ৭৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রাখা হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে। কাল বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন।

নতুন ভ্যাট আইনে যা থাকছে:
অভ্যন্তরীণ শিল্পের সুরক্ষায় বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের তালিকাও বহাল থাকছে। তাই নতুন ভ্যাট আইনে ১৭০টি পণ্য ও সেবায় সম্পূরক শুল্ক থাকার কথা। এর পরিবর্তে বিদ্যমান সম্পূরক শুল্কের তালিকার ১৪ শ পণ্য ও সেবার ওপরেই সম্পূরক শুল্ক রাখা হচ্ছে।

নতুন করে যেসব পণ্য ও সেবা ভ্যাট অব্যাহতির তালিকায় আসছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো হালকা প্রকৌশল খাতে মোটরসাইকেল, রেফ্রিজারেটর ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) সংযোজন শিল্প; ভোজ্যতেল; সফটওয়্যার শিল্প; বাস ট্রেন লঞ্চের টিকিট; সব ধরনের প্রশিক্ষণ সেবা, হার্টের রোগীর রিং, ডায়ালাইসিসের কৃত্রিম কিডনি ইত্যাদি।

নতুন আইনে মৌলিক খাদ্যপণ্য, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, গণপরিবহন, চিকিৎসা ও শিক্ষা, কৃষি, মৎস্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতের ১ হাজার ৮৭৪টি পণ্য ও সেবায় ভ্যাট অব্যাহতি আছে। শেষ মুহূর্তে এই তালিকায় আরও পণ্য ও সেবা যুক্ত হচ্ছে।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন- এসব খাতকে ভ্যাট অব্যাহতি দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোকে হিসাব রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত। এতে ওই প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আসবে। নতুন আইনটি তত বেশি কার্যকর করা সম্ভব হবে।

আরও আরও ছাড়:
বর্তমানে মোটরসাইকেল, রেফ্রিজারেটর ও এসি সংযোজন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন হারে ভ্যাট দিতে হয়। স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে এই তিন ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতার বাইরে রাখা হতে পারে। এতে দেশে তৈরি মোটরসাইকেল, রেফ্রিজারেটর ও এসির দাম কমতে পারে।

দেশে তৈরি সফটওয়্যার কিনলে বর্তমানে ৫ শতাংশ উৎসে ভ্যাট দিতে হয়। এটি আর থাকছে না। এমনকি ওয়েবসাইট তৈরি করে তা সরবরাহ পর্যায়েও ভ্যাট বসার কথা। এর ওপরেও ভ্যাট প্রত্যাহার করা হতে পারে। মোটা দাগে দেশীয় সফটওয়্যার শিল্পের সব ধরনের পণ্য বা সেবা সরবরাহের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার হচ্ছে।

এছাড়া আন্তনগর ট্রেনে ভ্রমণের টিকিটের ওপর নতুন আইনে ভ্যাট বসার কথা ছিল। এই ভ্যাট প্রত্যাহার হচ্ছে। ট্রেনের টিকিট কিনলে ভ্যাট দিতে হবে না। তবে এসি সিট বা বাথের টিকিট কিনলে ভ্যাট দিতে হবে। একইভাবে ৪০ সিটের অনধিক নন-এসি বাসের যাত্রীদের টিকিটের ওপর ভ্যাট দিতে হবে না। তবে এসি বাসের টিকিটে ভ্যাট কাটা হবে। তবে নগর সার্ভিসের এসি বা নন–এসি বাসের টিকিটে ভ্যাট থাকবে না। লঞ্চ-স্টিমারে ভ্রমণের টিকিটের ওপর ভ্যাট থাকবে না। এ ছাড়া রোগীদের আনা-নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবার ওপর ভ্যাট বসার কথা থাকলেও তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

বর্তমানে কেবল সরকারি প্রশিক্ষণ সেবার ওপর ভ্যাট অব্যাহতি আছে। নতুন ভ্যাট আইনে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রশিক্ষণ-কর্মশালার ওপর ভ্যাট তুলে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে প্রশিক্ষণ সেবা দেয়, সেগুলোতে অংশগ্রহণ করতে যে ফি নেওয়া হয়, তা ভ্যাটমুক্ত থাকবে। তবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের টিউশন ফিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফির ওপর ভ্যাট থাকবে। তবে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ফির ওপর ভ্যাট নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি মামলা আছে। সেই কারণে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভ্যাট আদায় করতে পারবে না এনবিআর।

ভোজ্যতেল আমদানি থেকে শুরু করে সরবরাহ ও বিক্রি—সব পর্যায়ে ভ্যাট মওকুফ করা হচ্ছে। বর্তমানে তিন পর্যায়ের পরিবর্তে এক পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়।

নতুন আইনে ভ্যাট মওকুফের জীবন রক্ষাকারী ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আবার কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতিতেও এ সুবিধা থাকছে। হার্টের রোগীদের অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে রিং পরাতে হয়। এই রিংয়ের ওপর ভ্যাট প্রত্যাহার করা হচ্ছে। আবার ডায়ালাইসিস করতে কৃত্রিম কিডনি যন্ত্র কেনায় ভ্যাট থাকবে না। তেমনি রক্তের ব্যাগ কিনতেও ভ্যাট দিতে হবে না।

৭৫০ বর্গফুটের কম আয়তনের ফ্ল্যাট কেনায় দেড় শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হতে পারে। আবার জমি কেনার নিবন্ধনের সময় আড়াই শতাংশ ভ্যাটও থাকছে না।

এছাড়া আগামী অর্থবছর থেকে আমদানি পর্যায়ে যে অগ্রিম ব্যবসায় কর (এটিভি) দেওয়া হয়, তা কাটার ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করা হচ্ছে। নতুন বছর থেকে পণ্য বা সেবার শুল্কায়নযোগ্য মূল্যের ওপরেই ৩ শতাংশ হারে এটিভি বসতে পারে। এতে করভার কিছুটা কমবে।

অন্যদিকে, ভ্যাটমুক্ত সীমা এবং টার্নওভার করের পরিধিও বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ৩০ লাখ টাকার পরিবর্তে ৩৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন হলে ওই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট দিতে হবে না। টার্নওভার করের পরিধি ৩৬ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত করা হতে পারে।

পরিবর্তন আসছে আয়করেও:
এবার আয়করেও বেশ কিছু বড় পরিবর্তন আসছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা আড়াই লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে ৩ লাখ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে সোয়া ২ কোটি টাকার বেশি সম্পদ থাকলে মোট আয়করের ১০ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। বাজেটে সারচার্জের আওতায় সীমা আড়াই কোটি টাকা করা হতে পারে। এছাড়া তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য আগামী বাজেটে সুখকর না–ও হতে পারে। বর্তমানে এই খাতে উৎসে কর দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করা হতে পারে।

এছাড়া, আমদানি পর্যায়ে আমদানি শুল্ক স্তরে পরিবর্তন আসবে না। তবে কিছু মধ্যবর্তী পণ্যকে কাঁচামালের পণ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। আমদানি পর্যায়ে সম্পূরক শুল্ক বাড়তে পারে ১ হাজার সিসির কম এবং ২ হাজার সিসির বেশি গাড়িতে। পুরোপুরি আমদানি করা মোটরসাইকেলেও সম্পূরক শুল্ক বাড়তে পারে।

উত্তরপূর্ব২৪ডটকম/ডেস্ক/এসবি

আপনার মন্তব্য

Developed By    IT Lab Solutions Ltd.

Helpline - +88 018 4248 5222